৬৩৭০। আবদুল আযীয ইবনু আবদুল্লাহ (রহঃ) ... ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি মুহাজিরদের কতক লোককে পড়াতাম। তাঁদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনু আউফ (রাঃ) অন্যতম ছিলেন। একদা আমি তার মিনাস্থ বাড়িতে ছিলাম। তখন তিনি উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) এর সাথে তার সর্বশেষ হাজ্জে রয়েছেন। ইত্যবসরে আবদুর রহমান (রাঃ) আমার কাছে ফিরে এসে বললেন, যদি আপনি ঐ লোকটিকে দেখতেন, যে লোকটি আজ আমীরুল মু’মিনীন এর কাছে এসেছিল এবং বলেছিল, হে আমীরুল মু’মিনীন! অমুক ব্যাক্তির ব্যাপারে আপনার কিছু করার আছে কি? যে লোকটি বলে থাকে যে, যদি উমর মারা যান তাহলে অবশ্যই অমুকের হাতে বায়আত করব। আল্লাহর কসম! আবূ বকরের বায়আত আকম্মিক ব্যাপার ছিল। ফলে তা সংঘটিত হয়ে যায়। এ কথা শুনে তিনি ভীষণভাবে রাগাম্বিত হলেন। তারপর বললেনঃ ইনশাআল্লাহ সন্ধায় আমি অবশ্যই লোকদের মধ্যে দাঁড়াব আর তাদেরকে ঐসব লোকের থেকে সতর্ক করে দিব, যারা তাদের বিষয়াদি আত্মসাৎ করতে চায়।
আবদুর রহমান (রাঃ) বলেন, তখন আমি বললাম, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি এমনটা যেন না করেন। কেননা, হাজ্জের (হজ্জের) মওসুম নিম্নস্তরের ও নির্বোধ লোকদেরকে একত্রিত করে। আর এরাই আপনার নৈকট্যের সুযোগে প্রাধান্য বিস্তার করে ফেলবে, যখন আপনি লোকদের মধ্যে দাঁড়াবেন। আমার ভয় হচ্ছে, আপনি যখন কোন কথা বলবেন তখন তা সর্বত্র দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। আর তারা তা যথাযথভাবে আয়ত্ত করতে পারবে না। আর যথাযথ স্থানে রাখতেও পারবে না। সুতরাং মদিনা পৌছা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। আর তা হল হিজরত ও সুন্নাতের কেন্দ্রস্থল। ফলে তথায় জ্ঞানী ও সুধীবর্গের সঙ্গে মিলিত হবেন। আর যা বলার তা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারবেন। জ্ঞানী ব্যাক্তিরা আপনার কথাকে যথাযথভাবে আয়ত্ত করে নেবে ও যথাস্থানে ব্যবহার করবে।
তখন উমর (রাঃ) বললেন, জেনে রেখো আল্লাহর কসম! ইনশাআল্লাহ আমি মদিনা পৌছার পর সর্ব প্রথম এ কাজটি নিয়ে ভাষনের জন্য দাঁড়াব। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আমরা যিলহাজ্জ মাসের শেষ দিকে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করলাম। যখন জুমআর দিন এল সূর্য অস্তগমনের সাথে সাথে আমি মসজিদে গমন করলাম। পৌছে দেখলাম, সাঈদ ইবনু যায়িদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল (রাঃ) মিম্বরের গোড়ায় বসে আছেন, আমিও তার পার্শ্বে এমনভাবে বসলাম যেন আমার হাটু তার হাঁটুকে স্পর্শ করছে। অল্পক্ষণের মধ্যে উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বেরিয়ে আসলেন। আমি যখন তাকে সামনের দিকে আসতে দেখলাম তখন সাঈদ ইবনু যায়িদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইলকে বললাম, আজ সন্ধায় অবশ্যই তিনি এমন কিছু কথা বলবেন যা তিনি খলীফা হওয়া থেকে আজ-পর্যন্ত বলেননি। কিন্তু তিনি আমার কথাটি উড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, আমার মনে হয় না যে, তিনি এমন কোন কথা বলবেন, যা এর পুর্বে বলেন নি।
এরপর উমর (রাঃ) মিম্বরের উপরে বসলেন। যখন মুয়াযযিনগণ আযান থেকে ফারিগ হয়ে গেলেন তখন তিনি দাঁড়ালেন। আর আল্লাহর যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, আম্মা বাদ! আজ আমি তোমাদেরকে এমন কথা বলতে চাই, যা আমারই বলা কর্তব্য। হয়তবা কথাটি আমার মৃত্যুর নিকটবর্তী হচ্ছে তাই যে ব্যাক্তি কথাগুলো যথাযথভাবে অনুধাবন করে সংরক্ষন করবে সে যেন কথাগুলো ঐসব স্থানে পৌছিয়ে দেয় যেথায় তার সওয়ারী পৌছবে। আর যে ব্যাক্তি কথা শুনেছেন যথাযথভাবে অনুধাবন করতে আশংকাবোধ করছে আমি তার জন্য আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করা ঠিক মনে করছি না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। আর তার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন। এবং আল্লাহর অবতীর্ণ বিযয়াদির একটি হচ্ছে রজমের আয়াত। আমরা সে আয়াত পড়েছি, অনুধাবন করেছি, আয়োত্ত করেছি। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজম করেছেন। আমরাও তার পরে রজম করেছি।
আমি আশংকা করছি যে, দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর কোন ব্যাক্তি এ কথা বলে ফেলতে পারে যে, আল্লাহর কসম! আমরা আল্লাহর কিতাবে রজমের আয়াত পাচ্ছি না। ফলে তারা এমন একটি ফরয বর্জনের দরুন পথভ্রষ্ট হবে, যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী ঐ ব্যাক্তির উপর রজম অবধারিত, যে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার পর যিনা করবে, চাই সে পুরুষ হোক বা নারী। যখন সুষ্পষ্ট প্রমান পাওয়া যাবে অথবা গর্ভ বা স্বীকারোক্তি বিদ্যমান থাকবে। অনুরূপভাবে আমরা আল্লাহর কিতাবে এও পড়তাম যে, তোমরা তোমাদের বাপ-দাদা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না। এটি তোমাদের জন্য কুফরী যে, তোমরা স্বীয় বাপ-দাদা থেকে বিমুখ হবে। অথবা বলেছেন, এটি তোমাদের জন্য কুফরী, যে স্বীয় বাবা-দাদা থেকে বিমুখ হবে জেনে রেখো! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আমার সীমাতিরিক্ত প্রশংসা করো না, যেভাবে ঈসা ইবনু মরিয়ামের সীমাতিরিক্ত প্রশংসা করা হয়েছে। তোমরা বল, আল্লাহব বান্দা ও তাঁর রাসুল।
এরপর আমার কাছে এ কথা পৌছেছে যে, তোমাদের কেউ এ কথা বলছে যে, আল্লাহর কসম, যদি উমর মৃত্যুবরণ করেন তাহলে আমি অমুকের হাতে বায়আত করব। কেউ যেন এ কথা বলে ধোকায় পতিত না হয় যে আবূ বকর এর বায়আত আকম্মিক ঘটনা ছিল। ফলে তা সংঘটিত হয়ে যায়। জেনে রেখো তা অবশ্যই এরূপ ছিল। তবে আল্লাহ আকম্মিক বায়আতের ক্ষতি প্রতিহত করেছেন। সফর করে সওয়ারীসমূহের ঘাড় ভেঙ্গে পড়ে-- এমন স্হান পর্যন্তদের মধ্যে আবূ বকরের ন্যায় কে আছে? যে কেউ মুসলিমদের পরামর্শ ব্যতিরেকে কোন ব্যাক্তির হাতে বায়আত করবে, তার অনুসরণ করা যাবে না এবং ঐ ব্যাক্তিরও না, যে তার অনুসরন করবে। কেননা উভয়েরই হত্যার শিকার হওয়ার আশংকা রয়েছে। যখন আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ওফাত দান করেন, তখন আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তি। অবশ্য আনসারগণ আমাদের বিরোধিতা করেছেন।
তারা সবাই বনী সাঈদার চত্বরে সমবেত হয়েছেন। আমাদের থেকে বিমুখ হয়ে আলী, যুবাইর ও তাদের সাথীরাও বিরোধিতা করেছেন। অপরদিকে মুহাজিরগণ আবূ বকরের কাছে সমবেত হলেন। তখন আমি আবূ বকরকে বললাম, হে আবূ বকর! আমাদেরকে নিয়ে আমাদের ঐ আনসার ভাইদের কাছে চলুন। আমরা তাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। যখন আমরা তাদের নিকটবর্তী হলাম তখন আমাদের সাথে তাদের দু’জন পূণ্যবান ব্যাক্তির সাক্ষাৎ হল। তারা উভয়েই ঐ বিষয়ের আলোচনা করলেন যে বিষয়ে লোকেরা ঐকমত্য করছিল। এরপর তারা বললেন, হে মুহাজির দল! আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? তখন আমরা বললাম, আমরা আমাদের ঐ আনসার ভাইদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। তারা বললেন, না আপনাদের তাদের নিকট না যাওয়াই উচিত। আপনারা আপনাদের বিষয় সমাপ্ত করে নিন।
তখন আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাদের কাছে যাব। আমরা চললাম। অবশেষে বনী সাঈদার চত্তরে তাদের কাছে এলাম। আমরা দেখতে পেলাম তাদের মাঝখানে এক ব্যাক্তি বস্ত্রাবৃত অবস্হায় রয়েছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ঐ ব্যাক্তি কে? তারা জবাব দিল ইনি সা’দ ইবনু উবাদা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ওনার কি হয়েছে? তারা বলল, তিনি জ্বরাক্রান্ত। আমরা কিছুক্ষণ বসার পরই তাদের খতীব উঠে দাঁড়িয়ে কালিমায়ে শাহাদাত পড়লেন এবং আল্লাহর যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন, আম্মা বাদ। আমরা আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্যকারী ও ইসলামের সেনাদল এবং তোমরা হে মুহাজির দল! একটি নগণ্য দল মাত্র; যে দলটি তোমাদের গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আমাদের কাছে পৌছেছে অথচ এরা এখন আমাদেরকে মূল থেকে সরিয়ে দিতে এবং খিলাফত থেকে বঞ্চিত করে দিতে চাচ্ছে। যখন তিনি নীরব হয়ে গেলেন তখন আমি কিছু বলার মনস্থ করলাম।
আর আমি পূর্ব থেকেই কিছু কথা সাজিয়ে রেখেছিলাম, যা আমার কাছে ভাল লাগছিল। আমি ইচ্ছে করলাম যে, আবূ বকর (রাঃ)-এর সামনে কথাটি পেশ করব। আমি তার ভাষণ থেকে সৃষ্ট রাগকে কিছুটা প্রশমিত করতে মনস্থ করলাম। আমি যখন কথা বলতে চাইলাম তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, তুমি থাম। আমি তাকে রাগাম্বিত করাটা পছন্দ করলাম না। তাই আবূ বকর (রাঃ) কথা বললেন, আর তিনি ছিলেন আমার চেয়ে সহনশীল ও গম্ভীর। আল্লার কসম! তিনি এমন কোন কথা বাদ দেননি যা আমি সাজিয়ে রেখেছিলাম। অথচ তিনি তাৎক্ষণিকভাবে অনুরূপ বরং তার চেয়েও উত্তম কথা বললেন। অবশেষে তিনি কথা বন্ধ করে দিলেন এরপর আবার বললেন, তোমরা তোমাদের ব্যাপারে যেসব উত্তম কাজের কথা উল্লেখ করেছ বস্তুত তোমরা এর উপযুক্ত।
তবে খিলাফতের ব্যাপারটি কেবল এই কুরাইশ বংশের জন্য নির্ধারিত। তারা হচ্ছে বংশ ও আবাসভূমির দিক দিয়ে সর্বোত্তম আরব। আর আমি এ দু’জনের থেকে যে-কোন একজনকে তোমাদের জন্য মনোনয়ন করলাম। তাই তোমাদের ইচ্ছা যে-কোন একজনের হাতে বায়আত করে নাও। এরপর আমার ও আবূ উবাইদা ইবনু জাররাহ (রাঃ) এর হাত ধরলেন। তিনি আমাদের মাঝখানেই বসা ছিলেন। আমি তার এ কথা ছাড়া যত কথা বলেছেন কোনটাকে অপছন্দ করিনি। আল্লাহর কসম! আবূ বকর যে জাতির মধ্যে বর্তমান রয়েছেন সে জাতির উপর আমি শাসক নিযুক্ত হওয়ার চেয়ে এটাই শ্রেয় যে, আমাকে পেশ করে আমার ঘাড় ভেঙ্গে দেয়া হবে, ফলে তা আমাকে কোন গুনাহের কাছে আর নিয়ে যেতে পারবে না। হে আল্লাহ! হয়ত আমার সাথী আমার মৃত্যুর সময় এমন কিছু আকাঙ্ক্ষা করতে পারে, যা এখন আমি পাচ্ছি না।
তখন আননারদের এক ব্যাক্তি বলে উঠল, আমি এ জাতির অভিজ্ঞ ও ক্ষেত্রজ্ঞ এবং শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট খেজুর বৃক্ষের ন্যায় সম্ভ্রান্ত। হে কুরাইশগণ! আমাদের থেকে হবে এক আমীর আর তোমাদের থেকে হবে এক আমীর। এ পর্যায়ে অনেক কথা শুনে হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল। আমি এ মতবিরোধের দরুন শংকিত হয়ে পড়লাম। তাই আমি বললাম, হে আবূ বকর! আপনি হাত বাড়ান। তিনি হাত বাড়ালেন। আমি তাঁর হাতে বায়আত করলাম। মুহাজিরগণও তাঁর হাতে বায়আত করলেন। তারপর আনসারগণও তার হাতে বায়আত করলেন। আর আমরা সা’দ ইবনু উবাদা (রাঃ) এর দিকে অগ্রসর হলাম। তখন তাদের এক ব্যাক্তি বলে উঠল, তোমরা সা’দ ইবনু উবাদাকে জানে মেরে ফেলেছ।
তখন আমি বললাম, আল্লাহ সা’দ ইবনু উবাদাকে হত্যা করেছেন। উমর (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! আমরা সে সময়কার জরুরী বিষয়াদির মধ্যে আবূ বকরের বায়আতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছুকে মনে করি নি। আমাদের ভয় ছিল যে, যদি বায়আতের কাজ অসম্পূর্ণ থাকে, আর এ জাতি থেকে পৃথক হয়ে যাই তাহলে তারা আমাদের পরে তাদের কারো হাতে বায়আত করে নিতে পারে। তারপর হয়ত আমাদেরকে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের অনুসরণ করতে হত, না হয় তাদের বিরোধিতা করতে হত, ফলে তা মারাত্বক ফ্যাসাদের কারণ হয়ে দাঁড়াত। অতএব যে ব্যাক্তি মুসলিমদের পরামর্শ ব্যাক্তিরেকে কোন ব্যাক্তির হাতে বায়আত করবে তার অনুসরণ করা যাবে না। আর ঐ ব্যাক্তিরও না, যে তার অনুসরণ করবে। কেননা, উভয়েরই হত্যার শিকার হওয়ার আশংকা বিদ্যমান।